লেখকঃ রবিউল আওয়াল শাওন
ছাত্র জীবনেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মিত হয়েছিল। অন্যায়ের সাথে আপোষহীন থাকা,সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকার কারণে বঙ্গবন্ধু সেই ছাত্রজীবন অসমাপ্তই থেকে যায়। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে আমরা দেখতে পাই যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনটা অনেক সংগ্রাম এবং পরিশ্রমের। ছাত্রজীবনেও তাঁকে অনেক সংগ্রাম এবং পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর সেই ছাত্র জীবনের অনুপ্রেরণার ঘটনাগুলো নিয়েই বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সূচনা হয়েছে এবং আমাদের জাতির পিতাতে পরিণত হয়েছেন।
১৯২০ সালে ১৭ই মার্চ বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন।
সাত বছর বয়সে ১৯২৭ সালে বঙ্গবন্ধু গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে বঙ্গবন্ধু ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে জাতির পিতা বিবাহিত জীবনে আবদ্ধ হন।
ছাত্রজীবনের শুরুতেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর মোট চার বছর পড়াশুনা ব্যাহত হয়। ১৯৩৪ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর চোখ বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়। এতে তাঁর হার্ট দুর্বল হয়ে পড়ে। চোখের চিকিৎসার জন্য কলকাতা নেয়া হয়। এই অসুখে তাঁর দুই বছর শিক্ষাজীবন নষ্ট হয়। ১৯৩৬ সালে আবারও বঙ্গবন্ধুর চোখে গ্লুকোমা রোগ হয়। এবারো তাঁকে চিকিৎসা নেয়ার জন্য কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়। ছাত্রজীবনের শুরুতে এভাবেই তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু শিক্ষার জন্য এন্ট্রান্স পাস করার পরে কলকাতা চলে যান। সেখানে ইসলামি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে পড়ার সময় ১৯৪৩ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্রলীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এভাবে ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক সফলতার গল্প রচিত হতে থাকে।
১৯৪৭ সালে শান্তি মিশন চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু মহাত্মা গান্ধীর সাথে দেখা করেন। ভারত পাকিস্তানের পাশাপাশি তৃতীয় রাষ্ট্র হিসেবে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে আন্দোলনে যোন দেন। যদিও এই উদ্যোগ বাতিল হয়।কিন্তু ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের তৎকালীন আন্দোলন স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। তাঁর বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে আইনজীবী বানাবেন। সম্ভবত এ জন্যই তিনি আইন বিভাগে ভর্তি হন। এই সময়ে তিনি আরও গভীরভাবে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।
ছাত্র রাজনীতিকে বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদ,অসাম্প্রদায়িক চেতনা,নিপীড়নের অবসান গড়তে ১৯৪৮ সালে ৪টা জানুয়ারী বর্তমান এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অনেক জেল-জুলুম এবং নির্যাতনের মধ্যেও তিনি রাজনীতিতে অটল ছিলেন। নেতা হওয়া কিংবা সুনাম অর্জনের জন্য তিনি রাজনীতি করেন নাই। রাজনীতি করেছেন দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তারিখে তার সৃষ্ট ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে বিভিন্ন দাবীদাবা নিয়ে আন্দোলনে আসেন বঙ্গবন্ধু।
১৯৪৯ সালে ছাত্র রাজনীতির ইতি টানেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ঐই বছর ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন নিপীড়িত মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু।
পাকিস্তান সরকার যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছিল তখন বঙ্গবন্ধুসহ সকল ছাত্র কঠোর প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তা সহ্য করতে পারেনি। তারা বঙ্গবন্ধুসহ বহু ছাত্রনেতাকে কারাবরণে বাধ্য করে। এই ঘটনা ঘটে ১৯৪৮ সালে। তারপর থেকে এদেশের ছাত্রসমাজ উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়নি।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালে যখন আইন বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র তখন তাঁর ছাত্রজীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের মধ্যে দাবি-দাওয়া নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। এটি নিয়ে তাদের মধ্যে আন্দোলনের তোড়জোড় শুরু হয়। এক পর্যায়ে তারা ধর্মঘটে চলে যান। বঙ্গবন্ধুসহ বেশ কয়েক জন ছাত্রনেতাও কর্মচারীদের এই ধর্মঘটের সমর্থনে এগিয়ে আসে। ছাত্রদের সহযোগিতা ও সমর্থন কর্মচারীদের মধ্যে বিশাল সাহস জোগায়।

ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে ও পরিচালনায় কর্মচারীদের আন্দোলন তরাত্নিত করতে পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জন্য এক বিরাট চ্যালেন্জ হয়ে দাঁড়ায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুসহ ২৭ জন ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধুকে জরিমানা ও মুচলেকা দেয়ার শর্তে তাঁর ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু মুচলেকা দিয়ে এই শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা শেখ মুজিবের কাছে মর্যাদাপূর্ণ মনে হয়নি। মুচলেকা দেয়নি বলে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব বাতিল করে দেয়।
১৯৫২ সালে ২৬ শে জানুয়ারী পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হবে ঘোষণা দেন পাকিস্তান সরকার। কিন্তু বঙ্গবন্ধুসহ পূর্ব বাংলার ছাত্র জনতা তা মেনে নিতে পারে নাই। ১৬ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু জেলে বসে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবী টানা ১১ দিন আমরণ অনশনে বসেন। ইতিহাস সৃষ্টি ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী রাষ্ট ভাষা বাংলার দাবীতে ছাত্র জনতা রাজপথে নেমে আসে। আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হন সালাম,বরকত,রফিক,জব্বার, শফিউরসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা। শুরু হয় বিশ্ব ভাষা জয়ের ইতিহাস।
১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আবারো শুরু হয় স্বাধীনতাসহ নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির পথ।
১৯৫৪,৫৫,৫৬,৫৭,৫৮-৬১ সালের মাঝে অসংখ্য ঘটনা প্রবাহমান হয়।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনকে প্রত্যক্ষভাবে বঙ্গবন্ধু ছাত্রনেতাদের নিদের্শনা দিয়ে যৌক্তিক দাবী অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ঘোষণার পর পাকিস্তান সরকারের ভিত্তি কেপে উঠে। তারা বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের লিপ্ত হয়। ৬ দফা আন্দোলনে ছাত্র নেতারা জোড়ালো সমর্থন জানায় বঙ্গবন্ধুকে। ছাত্র নেতারাই ছিল বঙ্গবন্ধুর শক্তি। ১৯৬৮ সালের ৩ই জানুয়ারী পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।এতে ৩৫ জনকে আসামী করা হয়। ১৯৬৯ সালের ছাত্রনেতাদের আন্দোলনের কারণ সরকার আগরতলা মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়।১৯৬৯ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারী ছাত্র জনতা “বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে আমাদের জাতির পিতাকে।
৫ই ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামীলীগের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ করেন “বাংলাদেশ”।
১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের পূর্ব পাকিস্তান অংশের ১৬৯টি আসনের মাঝে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩১০ টির মাঝে ২৯৮টি আসনপ আওয়ামীলীগ জয়লাভ করে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে আওয়ামীলীগ ক্ষমতা আসার পরও পাকিস্তান সরকার তাদের ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। শুরু হয় আবারো আমাদের উপর অত্যাচার।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ আওয়ামীলীগের আয়োজনে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামে ডাক দেন,তিনি বলেন
এবারের সংগ্রাম,আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম,স্বাধীনতার সংগ্রাম।
জয় বাংলা বলে বঙ্গবন্ধু জনসভার ইতি টানেন।
২৫ মার্চ কালো রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়।শুরু হয় আমাদের উপর গুলি বর্ষণ। শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার সংগ্রামের আদর্শিক ভূমি। বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল স্বাধীনতার বাংলাদেশের (মুজিব নগর সরকার) প্রথম সরকার ঘটিত হয় এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি,অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী হন তাজ উদ্দিন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী মোঃ মনসুর আলী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কামারুজ্জামান। এই মাসে দীর্ঘ নয় মাস সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র পেয়েছি।
১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী আমাদের বাঙ্গালী জাতির মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার নিজ মাতৃভূমি স্বাধীন রাষ্ট্রে পা রাখেন।
স্লোগানে মূখরিত থাকে বাংলার আকাশ-বাতাস আমার নেতা,তোমার নেতা শেখ মুজিব,শেখ মুজিব।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ইতিহাসের স্বর্ণ অক্ষরে আমাদের অন্তরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই,কারণ কৃতিমানের মৃত্যু নেই।
বঙ্গবন্ধু আজীবন বাঙ্গালি জাতির মাঝে বেঁচে থাকবে।